দেশে শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারের পলিসি সাপোর্ট
বাংলাদেশে স্টার্টআপগুলোর ব্যর্থতার হার অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে নীতিগত সহায়তার অভাব। উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী পলিসি সাপোর্ট পেলে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বড় বড় কোম্পানিতে রূপ নিতে সক্ষম হবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে উইন্ডি টাউন হলে অনুষ্ঠিত ‘বিল্ডিং অ্যা সাসটেইনেবল আইসিটি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নুরুল হাই।
মূল প্রবন্ধে নুরুল হাই দেশের বর্তমান স্টার্টআপ অবকাঠামো, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে টেকসই করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার-ট্যালেন্ট কনভার্সন, ক্যাপিটাল ডেফথ, মার্কেট অ্যাক্সেস, বিশ্বস্ত অবকাঠামো এবং এক্সিট পাথওয়ে-নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি দেশের ডিজিটাল উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে জানান, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ১৮ কোটি ৭০ লাখ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ কোটি ৯৮ লাখ, যার মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাড়ে ১১ কোটির বেশি। পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারকারী রয়েছে অন্তত ২৩ কোটি ৯৩ লাখ।
নুরুল হাই বলেন, দেশের স্টার্টআপগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ক্যাপিটাল ও ফাইন্যান্স, মার্কেট অ্যাক্সেস, ট্রাস্ট ও কমপ্লায়েন্স এবং এক্সিট ও রিপ্যাট্রিয়েশন। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার ইতোমধ্যে স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট, গ্র্যান্টস, ফান্ড অব ফান্ড এবং মনিটরিং নেটওয়ার্কসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর মূল প্রবন্ধের আলোকে আলোচনায় অংশ নেন দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তারা। শিখো ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহীর চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে পরিচিত করতে স্টার্টআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্সেশন ও উচ্চ ইন্টারনেট খরচ সাধারণ মানুষের কাছে স্টার্টআপ সেবার বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সিইও বিজন ইসলাম বলেন, স্টার্টআপ খাতের জন্য একটি স্বাধীন ও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান না থাকাই বড় সমস্যা। এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে নীতিগত সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।
চালডাল ডটকমের সিইও ওয়াসিম আলীম বলেন, আইসিটি খাতে বাজেট তুলনামূলকভাবে কম। অথচ এই খাত জিডিপিতে বড় অবদান রাখছে। বাজেট বাড়ানো না হলে আইসিটি খাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
পাঠাও বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, স্টার্টআপ পলিসি আরও সহজ করা জরুরি। বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্টার্টআপ বাংলাদেশের ফান্ড অব ফান্ড উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের আশাবাদী করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশের মোবাইল, ইন্টারনেট ও এমএফএস ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে ব্যবহৃত ডেটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভুল বা অতিরঞ্জিত ডেটার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে স্টার্টআপ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
শেয়ারট্রিপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও সাদিয়া হক বলেন, ফান্ড অব ফান্ড উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন জটিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
সবশেষে বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েেছে, যা দর্শনার্থীদের এই অত্যাধুনিক ইন্টারনেট প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।
আয়োজকরা জানান, দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন প্রদর্শনী সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রদর্শনীতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও অনলাইনে (www.ddiexpo.com.bd) অথবা স্পট রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।
চার দিনের প্রদর্শনীতে গোল্ড স্পন্সর ইপসন, অনর, এইচপি, লেনোভো, অপো, স্যামসাং, টেকনো ও শাওমি। সিলভার স্পন্সর এসার, গিগাবাইট, নেটিস, টিপি-লিংক ও ইউসিসি। এছাড়া স্টারলিংক পার্টনার স্টারলিংক ফিলিসিটি আইডিসি।
সহযোগিতায় বাংলাদেশ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব), বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম (বিআইজেএফ) এবং টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশ (টিএমজিবি)।